Home •ইসলাম হজ্বঃ মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান

Article comments

হজ্বঃ মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 28 September 2014 08:53

হজ্ব কেন সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান?

মানব সমাজে বহুবিধ ধর্ম। প্রতি ধর্মে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু হজ্ব কেন সকল ধর্মের সর্বপ্রকার অনুষ্ঠান থেকে অনন্য ও শ্রেষ্ঠতর? কোন অনুষ্ঠানই শুধু ধর্মীয় হওয়ার কারণে শ্রেষ্ঠতর হয় না। সেসব অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হওয়াতেও তা কল্যাণকর বা শ্রেষ্ঠতর হয় না। উলুধ্বনি,শঙ্খা ধ্বনি, আলোক সজ্জা,আতশবাজি ও বিচিত্র বেশধারনেও ব্যক্তির জীবনে কল্যাণ আসে না। ভারতে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবছর গঙ্গাস্নানে হাজির হয়।পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে বহুমানুষ মন্দিরে যায়।মুর্তির পদতলে ভেট দেয়। ক্যাথলিক খৃষ্টানদের বিশ্বাস, শিশুর জন্মই পাপ নিয়ে। তাই বাপ্টিটিজমের নামে শিশুকে গোছল দিয়ে পবিত্র করে।কিন্তু পানিতে কি পাপ দূর হয়? পরিষ্কার হয় কি চেতনা ও চরিত্রের ময়লা? পবিত্র হয় কি মন? বিপ্লব আসে কি আচরনে? চারিত্রিক বিপ্লব তো দেহ ধৌত করায় আসে না।বিচিত্র বেশধারণ বা দেব-দেবী,সাধুসন্নাসী ও ভগবানের নামে নানারূপ রূপকথা,লোককথা বা অলৌলিক কিচ্ছাকাহিনী পাঠেও আসে না।সে জন্য তো চাই এমন এক বিপ্লবী দর্শন যা মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে এবং আঘাত হানে চিন্তা-চেতনার মূল ভূমিতে। এবং বিলুপ্ত করে ধর্ম,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে জমে উঠা অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের বিশাল আবর্জনাকে। এভাবেই তো পরিশুদ্ধি ও বিপ্লব আসে চেতনা ও চরিত্রে। তখন বিপ্লব আসে রাষ্ট্রজুড়ে। এভাবেই তো উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়।

ব্যক্তি,সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে বিপ্লবের জন্য শুধু বিপ্লবী দর্শনই জরুরী নয়,অপরিহার্য হলো এমন কিছু বিপ্লবী মহানায়ক যারা শুধু কথা দিয়ে নয়,নিজেদের কর্ম,চরিত্র ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েও মানুষকে পথ দেখায়।এভাবেই তো অন্যরা অনুকরণীয় আদর্শ পায়। মানব ইতিহাসের সে আদর্শ মহানায়কেরা হলেন নবী-রাসূলগণ।ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের বিপ্লবে এমন আদর্শনীয় ব্যক্তিদের গুরুত্ব অপরিসীমযে ব্যক্তি জীবনে কোনদিনই কোন গোলাপ ফুল দেখেনি, সে কী করে গোলাপ ফুলের ছবি আঁকবে? ছবি আঁকার জন্য তো প্রথমে নিজ মনের অঙ্গণে গোলাপের ছবি থাকাটি জরুরী। তেমনি যে ব্যক্তি পূণ্যবান ব্যক্তির পরিচয়ই পেল না সেই বা কীরূপে নিজেকে পূণ্যবান ও পবিত্র করার পথ খুঁজে পাবে? মানব জাতিকে পথ দেখাতে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু আসমানি কিতাবই নাযিল করেননি,বরং সমাজের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে নবী রূপে নিযুক্ত করেছেন। তাই ইসলাম শুধু মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাসকেই অনিবার্য করে না,বরং অনিবার্য করে নবীরাসূলদের বিশ্বাস করা ও তাদেরকে মেনে চলাকেও। পবিত্র কোরআনে তাই “আতিউল্লাহ”র সাথে “আতিউর রাসূল” ফরজ করা হয়েছে। নবীরাসূলদের মাধ্যমে মানুষকে পথ দেখানো এবং সমাজ জুড়ে বিপ্লব আনাই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। প্রতিটি ব্যক্তির অপরিহার্য দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহর সে মিশনের সাথে একাত্ম হওয়া। ব্যক্তি একমাত্র এভাবেই পায় পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা।এবং পরকালে পায় নেয়ামত ভরা জান্নাত। কোরআনে তাই বলা হয়েছেঃ “তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি উম্মীদের মাঝে তাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল নিযুক্ত করেছেন যিনি তাদের সামনে পাঠ করে শোনান তাঁর আয়াত এবং তাদের মধ্যে আনেন পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা,এবং শিক্ষা দেন কিতাব এবং প্রজ্ঞা। এবং এর পূর্বে তারা ছিল সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।” –(সুরা জুমু’আ ,আয়াত ২)।

মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বা বিপর্যয়টি খাদ্যাভাবে বা অর্থাভাবে আসে না।ভগ্ন স্বাস্থ্যেও নয়। সেটি আসে সত্যকে খুঁজে না পাওয়া বা সত্য থেকে বিচ্যুতি তথা পথভ্রষ্টতার কারণে। অপর দিকে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যানটি আসে সত্যকে খুঁজে পাওয়া,সে সত্যের পূর্ণ অনুসরণ ও বিভ্রান্তু থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে। মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার তাই বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কার নয়।সেটি হলো জীবন ও জগতের স্রষ্টা নিয়ে সত্যের আবিষ্কার।আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো সে সত্যকে না চেনা,বা সেটিকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা। সত্য-আবিস্কারের সফলতাটিই ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতাটি দেয়।সেটি,অনন্ত অসীম কালের জন্য জান্নাতপ্রাপ্তি। আর  সত্য আবিস্কারে ব্যর্থ হলে সে ব্যর্থতাটি ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুণে নিয়ে হাজির করে। তখন সমাজ এবং রাষ্ট্রও দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভরে উঠে।পৃথিবীর বুকেও তখন জাহান্নামের আযাব নেমে আসে।

সমগ্র মানব ইতিহাসে সত্য আবিস্কারে সবচেয়ে সফল ও শিক্ষণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)।এই একটি মাত্র কারণেই তিনি সমগ্র মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাঁর জন্ম কোন পয়গম্বরের ঘরে হয়নি। বরং জন্ম হয়েছিল পৌত্তলিক এক পিতার ঘরে। মুর্তিপুজা ও মুর্তিনির্মানই ছিল তার পেশা। কিন্তু  সে দূষিত পরিবেশে জন্ম নিয়েও পৌত্তলিকতার স্রোতে তিনি ভেসে যাননি। বরং সত্যের আবিস্কারে নিজের সকল প্রতিভা ও সামর্থকে তিনি নিয়োজিত করেছিলেন। জীবনের শুরু থেকেই তাঁর মনে অদম্য আগ্রহ ছিল,কে এই বিশাল বিশ্বজগতের স্রষ্টা সে সত্যটি জানার? যখন সে সত্যকে খুঁজে পেলেন তখন শুরু হলো জীবনের প্রতি পদে সে পথে চলায় প্রচন্ড আপোষহীনতা। সত্যের পথে চলায় জীবন দানও তখন তাঁর কাছে অতি তুচ্ছ বলে মনে হলো। তাই নমরুদের বাহিনী যখন জ্বলন্ত আগুনের মাঝে ফেলে তাঁকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করলো তখনও এ মহান ব্যক্তিটি সে সত্য থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হননি। যথন নিজের একমাত্র শিশু ইসমাঈলের কোরবানীর হুকুম এলো তখনও সে হুকুম পালনে তিনি সামান্যতম ইতস্তত করেননি।

 

শুধু সত্যের আবিস্কার নয়, সে সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন অতি আপোষহীন। তাঁর অধীনে কোন সেনাদল বা ক্যাডারবাহিনী ছিল না। ভক্তদের বিশাল কোন দলও ছিল না।তিনি ছিলেন প্রায় একা। অথচ একাকী হয়েও তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন নমরুদ, নমরুদের আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনী ও তার অনুসারি পৌত্তলিক সমাজ ও জনগণের বিরুদ্ধে। আল্লাহর উপর বিশ্বাস ও তাঁর দ্বীন অনুসরণে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যে কতটা নির্ভীক ও আপোষহীন ছিলেন সে সাক্ষ্যটি অন্য কারো নয়, সেটি মহান আল্লাহর। মহান আল্লাহপাক তাঁর নিজের সে সাক্ষ্যকে লিপিবদ্ধ করেছেন পবিত্র কোরআন। সে মহান যোদ্ধাকেই তিনি আদর্শরূপে খাড়া করেছেন বিশ্বের তাবত সত্যান্বেষী মানুষের জন্য। মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে ইব্রাহীম ও তার সঙ্গিদের মাঝে” –(সুরা মুমতিহানা আয়াত ৪)।কিন্তু কেন তিনি উত্তম আদর্শ সে কারণটি তুলে ধরেছেন উপরুক্ত আয়াতেরই বাঁকি অংশে। নিজ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর ঘোষণাটি ছিল এরূপ,“আমি নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি তোমাদের থেকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যা কিছুর ইবাদত করো তা থেকে। আমার বিদ্রোহ তোমাদের বিরুদ্ধে। শুরু হলো তোমাদের সাথে আমার অবিরাম যুদ্ধ ও শত্রুতা যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর একাত্ব অস্তিত্বকে মেনে না নিচ্ছ”।

 

মহান আল্লাহতায়ালা মানব ইতিহাসের এ সত্যসন্ধানী,সাহসী,জিহাদী ও আল্লাহর পথে অবিচল ব্যক্তিকে সম্মানিত করেছেন শুধু মানবজাতির জন্য আদর্শ রূপে ঘোষণা দিয়ে নয়,বরং তাঁকে নিজের বন্ধু রূপে গ্রহন করার মধ্য দিয়েও। প্রশংসা করেছেন তাদেরও যারা তাঁর সে মহান আদর্শকে অনুসরণ করে। তাই পবিত্র কোরআনের ঘোষণা,“তাঁর অপেক্ষা দ্বীন পালনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠ ভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? এবং আল্লাহ ইব্রাহীমকে নিজের বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছেন।”-(সুরা নিসা আয়াত ১২৫)। সত্যের অন্বেষণ ও অনুসরণে প্রবল সদ্বিচ্ছা ও লাগাতর প্রচেষ্টা থাকলে আল্লাহর সাহায্য লাভও ঘটে। তখন সফলতাও জুটে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর জীবনের সেটিও আরেক শিক্ষা। মানুষ তো পুরস্কার পায় তার ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা কারণে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ মহান আল্লাহতায়ালার বন্ধু হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছেন তো সে মহান নিয়েত ও প্রচেষ্টার বলেই।

 

হযরত ইব্রাহীমকে মহান আল্লাহতায়ালা ভূষিত করেছেন মুসলিম মিল্লাতের আদি পিতা রূপে। অথচ মানব ইতিহাসে প্রতিভাধর ব্যক্তির সংখ্যা কি কম? তাদের হাতে আবিষ্কারের সংখ্যাও কি কম? কোরআন নাযিলের শত শত বছর আগেও এসব প্রতিভাধরদের হাতে মিশরের পিরামিড,চীনের প্রাচীর ও ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগিচা নির্মিত হয়েছে। ইতিহাসে সেগুলো বিস্ময়কর আবিস্কার রূপে স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু মানব-প্রতিভার সে বিনিয়োগ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হননি,কারণ সে প্রতিভাবান মানুষেরা ব্যর্থ হয়েছে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার ন্যায় অতি মৌলিক কাজে। আজও  কি এরূপ প্রতিভাধারিদের ব্যর্থতা কম? বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে তারা নবেল প্রাইজ পেলেও সত্যকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা আদিম বর্বর যুগের মানুষের ন্যায়ই মুর্খ। তাদের সে মুর্খতা কি হাজার হাজার বছর আাগের উলঙ্গ গুহাবাসীর চেয়ে কম? ফলে তাদের জীবনে বেড়েছে সত্য-চ্যুতি ও বিভ্রান্তি। অসভ্য গুহাবাসীর ন্যায় তাদের জীবনেও এসেছে তাই আদীম অজ্ঞতা ও পাপাচার। সনাতন মিথ্যা তো আজও  বেঁচে আছে মিথ্যার পক্ষে এসব প্রতিভাধারিদের অস্ত্র ধরার কারণে।এসব প্রতিভাবান আবিষ্কারকদের দুস্কৃতির কারণেই বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিতে হয়েছে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে। তারা আজও  হত্যা পাগল ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মিরসহ বিশ্বের নানা প্রান্তরে। লক্ষ লক্ষ মানুষের আজও তাই প্রাণ যাচ্ছে। হাজার হাজার নারীকে তাই আজও ধর্ষিতা হতে হচ্ছে। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো হয়েছে সত্য আবিষ্কারে ব্যর্থতা ও ভ্রান্ত পথে মেধার বিপুল বিনিয়োগের ফলে। তাই সত্য আবিস্কারে হযরত ইব্রাহীমের নানা প্রচেষ্টার কথা পবিত্র কোরআনে বার বার বর্নিত হলেও এসব প্রতিভাধর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকদের নিয়ে এক ছত্র উল্লেখও নাই। মহান আল্লাহতায়ালা জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনে শুধু চোর-ডাকাত,খুনি,ব্যাভিচারি ও সন্ত্রাসীদেরই নিক্ষেপ করবেন না,নিক্ষেপ করবেন সত্য আবিস্কারে ও সত্যের অনুসরণে যারা বিফল তাদেরও। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য-আবিষ্কারক হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে সমগ্র হজ্ব অনুষ্ঠানের মধ্যমঞ্চে রেখে বিশ্ববাসীকে বহু কিছুই শেখাতে চান।সে মূল শিক্ষাটি হলো,সত্যের আবিস্কার ও সত্যের আপোষহীন অনুসরণে আমৃত্যু লেগে থাকার। সেটি সত্যের শত্রুর বিরুদ্ধে লাগাতর লড়াইয়ের। সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে আজীবন আত্মসমর্পণের। সেটিই হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র পবিত্র সূন্নত। হজ্বের এখানেই অনন্যতা।হজ্ব এ জন্যই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান।

বিশ্বজনীন হজ্ব

হজ্ব বিশ্বজনীন।এক্ষেত্রটিতেও হজ্বের আরেক শ্রেষ্ঠত্ব।সত্যকে যেমন ভাষা,বর্ণ বা ভৌগলিকতা দিয়ে বিভক্ত করা যায় না,তেমনি বিভক্ত করা যায় না হজ্বকেও।পৃথিবীর নানা দেশের নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষ সেখানে জমা হয়।হজ্বের মঞ্চে পৃথিবীর সবচেয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিটি যেমন জমা হয়,তেমনি তার পাশেই জমা হয় সবচেয়ে শেতাঙ্গ ব্যক্তিটিও।একই মঞ্চে জমা হয় নানা দেশের শিয়া-সূন্নী,হানাফী-শাফেয়ী,হাম্বলী-মালেকী,দেউবন্দী-বেরেলভীগণ।তাদের মাঝে ফেকাহগত বিরোধ থাকলেও হজ্ব নিয়ে কোন বিরোধ নাই। দিন-ক্ষণ নিয়ে বিরোধের কোন সুযোগও নেই। সেটি বেঁধে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এমন মহামিলন ও এমন আচার কি আর কোন ধর্মে আছে? বাঙালী হিন্দুর দুর্গা পুজায় কি কোন বিহারী,গুজরাতী,মারাঠি বা পাঞ্জাবী হিন্দু যোগ দেয়? আবাঙালী হিন্দুর দেউয়ালীতেই বা ক’জন বাঙালী যোগ দেয়? তেমনি কাথলিক খৃষ্টানদের কোন অনুষ্ঠানে কি ইউরোপীয় প্রটেষ্টান্ট,মিশরীয় কপটিক,গ্রীক অর্থোডক্স বা আর্মেনিয়ান খৃষ্টানগণ নজরে পড়ে? খৃষ্টান ধর্মে কি এরূপ কোন অনুষ্ঠান আছে যেখানে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের সাথে আফ্রিকান বা ভারতীয় খৃষ্টানদের যোগ দেয়াটি ফরজ? অন্য ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি তো এভাবে বেঁচে আছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা,বর্ণ ও ভূগোলের পরিচয় নিয়ে। হিন্দু ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম,শিখ ও জৈন ধর্মের ন্যায় বহু ধর্মের ভিত্তিটা এতটাই বর্ণ ও আঞ্চলিকতায় আচ্ছন্ন যে এসব ধর্মের অনুসারিরূপে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের খুঁজে পাওয়া কঠিন। এভাবে এ ধর্মগুলি কাজ করেছে মানব সমাজে বিভক্তি, সংঘাত ও অকল্যাণ বাড়াতে। অথচ হজ্ব শেখায় বিশ্বজনীন ভাতৃত্ব ও একতা।হজ্ব তাই নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা রাষ্ট্রের নামে গড়া বিভক্তির প্রাচীর ভাঙ্গতে শেখায়।একতা গড়ার মিশনটি জোরদার করতেই হজ্ব পৃথিবীর সকল দেশ ও সকল ভাষার মুসলমানদের একই সময়ে,একই সাথে একই মঞ্চে হাজির করে।আল্লাহর বিধান যে কতটা নিখুঁত ও কল্যাণধর্মী এ হলো তার নমুনা।

অন্যধর্মের অনুষ্ঠানগুলির ন্যায় হজ্ব নিছক ধর্মীয় আচার নয়।পাদ্রী ও পুরোহিতের মন্ত্র পাঠে তা শেষ হয় না। এ অনুষ্ঠানে তাই কোন পুরোহিত নাই, কোন ইমামও নাই। বহু শ্রম, বহু অর্থ ব্যয়ে নিজের হজ্জ নিজেকেই পালন করতে হয়। হজ্ব দেয় আত্মত্যাগের এক বিপ্লবী দর্শন। শুরুটি হয় দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লেষ ও বিপুল অংকের অর্থব্যয় দিয়ে।এভাবে হজ্ব গড়ে সম্পদ ব্যয়ের অভ্যাস।শুরু হয় দৈহীক কসরত। সে সাথে দেয় গভীর আধ্যাত্মীকতা,দেয় সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রূপে বেড়ে উঠার মহাপ্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের আয়োজনে হজ্ব বস্তুত অনন্য। এর কারণ,হজ্বে পালনীয় প্রতিটি বিধান বেঁধে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে।হজ্বের কোন বিধানই মানুষের পরিকল্পিত নয়।সমগ্র অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর পরিকল্পনা ও নির্দেশনায়,তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ জমায়েতের পরিকল্পনা ও পরিচালনা নিয়ে কোন বিরোধ নাই। ফলে হজ্বের সাথে কি অন্যধর্মের কোন অনুষ্ঠানের তুলনা হয়?

হজ্বের শিক্ষা ও মুসলমানদের ব্যর্থতা

কিন্তু হজ্ব যে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান -সে চেতনাটি মুসলমানদের মাঝে কতটুকু? মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ আয়োজন থেকে শিক্ষা হাসিলের আয়োজনই বা কতটুকু? হজ্ব পালিত হয় জিলহজ্ব মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত লাগাতর নানা পর্ব দিয়ে। হজ্বের সাথে আসে ঈদুল আযহা। হজ্ব পর্বটি মক্কা শরীফে পালিত হলেও ঈদুল আযহা পালিত হয় সমগ্র বিশ্বজুড়ে। হজ্বের শিক্ষাটিই বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় এই ঈদুল আযহা। কিন্তু কি সে শিক্ষা? কি এর দর্শন? ঈদুল আযহা কি শুধু পশু কোরবানী? ছোট্ট একটি সামাজিক অনুষ্ঠানেরও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। হজ্বের লক্ষ্য কি স্রেফ হজ্ব পালন? বহু অর্থ ও বহু শ্রম ব্যয়ে বিশ্বের নানা দেশ থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ লাখ মানুষ কেন মক্কায় হাজির হয়? সামর্থবানদের উপর কেন এটি ফরজ? ক্বাবাকে ঘিরে কেন ৭ বার তাওয়াফ? কেন মিনায় তিন দিন অবস্থান? আরাফাতে কেন মহাজমায়েত? মোজদালেফায় খোলা অকাশের নিচে কেন শয়ন? শয়তানের স্তম্ভে কেন তিন দিন ধরে পাথর নিক্ষেপ? কেন সাফওয়া ও মারওয়ার মাঝে নারী-পুরুষ,যুবক-বৃদ্ধার দৌড়াদৌড়ি? সেটিও একবার নয়,সাতবার!কেন লক্ষ লক্ষ পশু কোরবানী? এগুলি কি নিছক আচার? এগুলির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কোন দর্শন ও উদ্দেশ্য থাকলে সেটিই বা কি? যে ইবাদতে এত অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় ও সময়ব্যয় তা থেকে মুসলিম উম্মাহই বা কতটুকু লাভবান হচ্ছে? প্রতিবছর হাজী হয়ে ফিরছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ,তাতেই বা তাদের কি কল্যাণ হচ্ছে? বিষয়গুলি অতিশয় ভাবনার। কিন্তু মুসলমানদের মাঝে সে ভাবনা কই? হজ্বের প্রতিপর্বের প্রতিটি অনুষ্ঠানের মূল পরিকল্পনাকারি যে মহান আল্লাহতায়ালা সে হুশ বা ক’জনের?

যে পাঁচটি খুঁটির উপর ইসলামের ভিত্তি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি হলো হজ্ব। তাই হজ্বকে বাদ দিয়ে ইসলামের পূর্ণ ইমারত নির্মাণ করা যায় না। এবং ইসলামের এ বিশাল ইমারতটি ধ্বসিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন নেই পাঁচটি খুঁটির সবগুলি ধ্বংসের,যে কোন এই একটি খুঁটির বিনাশই সে জন্য যথেষ্ট? আল্লাহতায়ালার কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়,সে মহান আল্লাহর খলিফা। খলিফা রূপে তার দায়িত্বটি পৃথিবীর বুকে আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বের। মানুষ আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্ঠি শুধু এ পরিচয়ের কারণেই,দৈহিক শক্তি বা অন্য কোন গুণের কারণে নয়। আর সে পরিচয়ে বেড়ে উঠা ও টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হলো লাগাতর প্রশিক্ষণ। সে প্রশিক্ষণের পূর্ণ নির্দেশনা এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। ইসলামের বিধানগুলো মূলত সে প্রশিক্ষণেরই পূর্ণ প্যাকেজ। সে প্রশিক্ষণ পূর্ণ করতেই নামায-রোযার বিধান যেমন এসেছে,তেমনি এসেছে হজ্ব-যাকাত ও জিহাদের বিধান। মহান আল্লাহতায়ালা চান,প্রতিটি ঈমানদার ব্যক্তি সে প্রশিক্ষন নিয়ে বেড়ে উঠুক। কারণ,একমাত্র সে ভাবে বেড়ে উঠার মধ্যেই মু’মিন ব্যক্তির সফলতা। তখন সে সফল হয় পৃথিবী পৃষ্ঠে খেলাফতের দায়িত্বপালনে। আল্লাহপাক তো মু’মিনের জীবনে সে সফলতাটিই দেখতে চান। মু’মিন জান্নাত পাবে খেলাফতের দায়িত্ব পালতে সফল হওয়ার বিণিময়ে। যার মধ্যে সে প্রশিক্ষণ নাই,বুঝতে হবে তার মধ্যে আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্বপালনের সামর্থও নাই। আর সে প্রশিক্ষণের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হজ্ব। তাই সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যার মধ্যে হজ্ব নাই,বুঝতে হবে আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনে তার মধ্যে কোন আগ্রহও নেই। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, “সামর্থ থাকা সত্বেও হজ্ব না করে যার মৃত্যু হলো সে খৃষ্টানরূপে না ইহুদীরূপে মারা গেল তা নিয়ে তাঁর কিছু যায় আসে না।” অর্থাং তার জন্য নবীজী (সাঃ)সুপারিশ করতে রাজি নন। বোখারী শরীফের হাদীসে বর্নীত হয়েছে, নবীজী (সাঃ) হযরত আয়েশাকে বলেছেন,হজ্বই তাঁর জন্য জিহাদ।

মর্যাদা শ্রেষ্ঠ ইবাদতের

ইসলামে কোনটি শ্রেষ্ঠ এবাদত তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন। সে প্রশ্ন জেগেছিল ইমাম হযরত আবু হানিফার (রহ) মনেও। হজ্ব সমাপনের পর তিনি বলেছেন,হজ্বই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহ) বলেছেন,যাদের মনে আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রবল ভালোবাসা,তারা তৃপ্তি পেতে পারেন হজ্বে গিয়ে। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়,হজ্ব কেন শ্রেষ্ঠতম ইবাদত? কেনই বা এটি আল্লাহর আশেকদের আত্মতৃপ্তি লাভের মাধ্যম? ইসলামে ইবাদত মূলতঃ দৈহিক,শারিরীক ও আত্মীক। একমাত্র হজ্বেই ঘটে সবগুলোর সমন্বয়। হজ্বের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। কালেমায়ে শাহাদত উচ্চারনে দৈহিক কসরত নেই। তাতে অর্থব্যয়ও নেই। এতে পাহাড়-পর্ব্বত,বিজন মরুভুমি, নদনদী বা সমুদ্র-মহাসমুদ্র অতিক্রমেরও প্রয়োজন পড়ে না।তেমন দৈহীক কসরত নেই জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামায আদায়ে। এতটা কষ্টস্বীকার,এতটা অর্থব্যয় ও সময়ব্যয় হয় না রোজাতেও। যাকাতে অর্থব্যয় হলেও তাতে হজ্বের ন্যায় অর্থব্যয় নেই। শ্রমব্যয় এবং সময়ব্যয়ও নেই। বস্তুতঃ হজ্বের মধ্যে রয়েছে ইবাদতের সমগ্রতা তথা পূর্ণ প্যাকেজ। এযুগে বিমানযোগে হজ্বের যে সুযোগ সেটি নিতান্তই সাম্প্রতিক। বিগত চৌদ্দ শত বছরের প্রায় সমগ্রভাগ জুড়ে মুসলমানরা হজ্ব করেছে পায়ে হেঁটে বা উঠ,ঘোড়া ও গাধার মত যানবাহনে চড়ে। তখন দৈহিক ক্লান্তির ভারে হজ্বে গিয়ে অনেকেই আর নিজ ঘরে ফিরে আসতেন না,পাড়ী জমাতেন পরপারে। তাই সে আমলে শেষ বিদায় নিয়ে দূর-দেশের লোকেরা মক্কার পথে বেরুতেন। হজ্ব পালনে যে প্রচন্ড শারিরীক কসরত তার মূল্যয়াণ করতে হবে সে আঙ্গিকেই।

গড়ে হিজরতের অভ্যাস

ইসলামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো হিজরত।মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে গড়ে তোলার এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণও। হিজরত এখানে নিজ ঘর,নিজ পরিবার-পরিজন,নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য ও সহায়-সম্পদ পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কা ছেড়ে মদিনায় গিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে ফিলিস্তিত,মিশর ও হিজাজের পথে পথে হাজার হাজার মাইল ঘুরেছেন। হিজরত করেছেন হযরত ইউসুফ (আঃ),হযরত ইয়াকুব (আঃ)ও হযরত মূসা (আঃ)এর ন্যায় আরো বহু নবী-রাসূল। নিজ দেশ,নিজ ঘর,নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবার-পরিজনের বাঁধনে যে স্থবির জীবন,তাতে আবদ্ধ হলে আল্লাহর পথে চলাটি অসম্ভব। হজ্ব গড়ে তোলে সে স্থবিরতা ছিন্ন করে হিজরতের অভ্যাস। ব্যক্তিকে তার আপন ঘর থেকে হজ্ব বাইরে নিয়ে আসে। জীবনে আনে গতিময়তা। হিজরত ছাড়া উচ্চচতর জীবনবোধ ও সভ্যতার নির্মান কি সম্ভব? ইতিহাসের সবগুলো উচ্চতর সভ্যতাই তো মহাজিরদের সৃষ্টি। বলা হয়ে থাকে,‘সফর নিছফুল ইলম” অর্থঃ ভ্রমন হলো জ্ঞানের অর্ধেক। জ্ঞানার্জন ইসলামে ফরয। হজ্ব তো সফরকেও অনিবার্য করে তোলে। এভাবে সুযোগ করে দেয় অন্যদের দেখার এবং তাদের থেকে শেখার। হজ্ব দেয় নানা দেশের নানা জনপদের বিচিত্র পরিবেশে চিন্তাভাবনা ও ধ্যানমগ্নতার সুযোগ। সকাল থেকে সন্ধ্যা,সন্ধ্যা থেকে সকাল এরূপ বৃত্তাকারে ঘূর্ণায়নমান যে ব্যস্ত জীবন,সে জীবনে মহত্তর লক্ষ্য নিয়ে ভাববার অবসর কোথায়? অথচ জীবনের সঠিক উপলদ্ধি ও মূল্যায়নে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এরূপ তাফাক্কুহ বা চিন্তাভাবনা ইসলামে শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। নবীজীর হাদীসঃ “আফজালুল ইবাদাহ তাফাক্কুহ”। অর্থঃ শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো চিন্তাভাবনা করা। চিন্তা ভাবনার অভাবেই সুস্থ্য মানুষও ভারবাহী গাধায় পরিণত হয়। চিন্তাভাবনাকে অতি গুরুত্ব দিয়েছে মহান আল্লাহতায়ালাও।পবিত্র কোরআনে তিনি বহুআয়াত নাজিল করেছেন শুধু চিন্তাভাবনার গুরুত্ব বোঝাতে।আফালা তাফাক্কারুন, আফালা তাদাব্বারুন,আফালা তাক্বীলুন -চিন্তা ভাবনার সামর্থ থাকা সত্বেও মানুষ কেন চিন্তাভাবনা করে না পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতয়ালার সেটিই জিজ্ঞাসা।মোজাদ্দিদ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভি এবং বাংলার হাজী শরিয়াতুল্লাহ,দুদু মিয়া ও তিতুমীরের মত মহান ব্যক্তিবর্গ তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবক ও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পেয়েছেন হজ্বে গিয়ে। হজ্বে গিয়েই ইরানের বিপ্লবী লেখক ড.আলী শরিয়তি এবং বিখ্যাত মার্কিন নওমুসলিম ম্যালকম এক্স-য়ের ন্যায় শত শত ব্যক্তি জীবনের নতুন পাঠ পেয়েছিলেন। হজ্ব শেষে তারা নিজ দেশে ফিরেছিলেন আমুত্যু মোজাহিদ রূপে। হজ্বে গিয়ে তারা পেয়েছিলেন আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের প্রেরণা ও এক মহৎ প্রশিক্ষণ।অথচ চিন্তাভাবনাশূণ্য মানুষগুলো হজ্ব থেকে ফিরে স্রেফ হাজির খেতাব নিয়ে। এটি কি কম ব্যর্থতা?

যাদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার পথে গতিময়তা এবং ভাবনা নাই,তাদের জীবনে সিরাতুল মোস্তাকিমপ্রাপ্তিও নেই। ভাবনা শূন্যতাই মানুষকে ঈমানশূন্য করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা,সন্ধ্যা থেকে সকাল এমন ব্যক্তিগণ এক আমৃত্যু চক্রে বন্দী। এ বন্দীদশাতেই অবশেষে তারা একদিন মৃত্যুর পথে হারিয়ে যায়। অসংখ্য উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গের ন্যয় এভাবেই অতীতের গর্ভে হারিয়ে গেছে শত শত কোটি মানুষ। মহান আল্লাহতায়ালা এ ব্যস্ত মানুষকে সব ব্যস্ততা ফেলে তার ঘরে জমায়েত হওয়ার ডাক দেন। মিনা,আরাফাত ও মোযদাফিফায় অবস্থান তার জীবনে মারেফাত লাভ তথা ধ্যান মগ্ন হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আল্লাহর ডাকে এভাবে তাঁর ঘরে গিয়ে লাব্বায়েক তথা ‘আমি হাজির’ বলার মাঝে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যে একাত্মতা ঘটে তা কি আর কোন ইবাদতে সম্ভব? আর এ একাত্মতার মাঝে আল্লাহপাক তাঁর বান্দাহর জীবনের মূল পাঠটি তার চেতনার সাথে মিশিয়ে দিতে চান। সেটি হল আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক অর্থাৎ ‘আমি হাজির বলা”। মহান আল্লাহতায়ালার একজন একনিষ্ঠ গোলামের জীবনে এর চেয়ে উত্তম আচরণ আর কি হতে পারে? এর বিপরীত হল অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ,ব্যক্তির জীবনে সে অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ নিরেট পথভ্রষ্টতা দেয়। এবং পরিণামে সে পথভ্রষ্টতা জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। কথা হলো,যে মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আল্লাহর অবাধ্যতা,আল্লাহর সার্বভৌমত্ব যেখানে ভূলুন্ঠিত,প্রতিষ্ঠিত যেখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব, মুসলমানের রাজনীতি,পোষাক-পরিচ্ছদ,অর্থনীতি ও সংস্কৃতি যেখানে আল্লাহর বিরুদ্ধে অবাধ্যতার প্রতীক -সেখানে লক্ষ লক্ষ হাজীর মুখে লাব্বায়ক উচ্চারনের মূল্য কতটুকু? মহান আল্লাহতায়ালা কি বান্দাহর এমন ফাঁকা বুলিতে খুশি হন? মু’মিন ব্যক্তিকে তো লাব্বায়েক বলতে হয় ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূলে জিহাদেও।

সামর্থ দেয় আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলার

ঈমান হলো আল্লাহর প্রতি হুকুমে সর্বাবস্থায় ‘লাব্বায়েক’ (আমি হাজির) বলার সামর্থ।সে সামর্থটি না থাকলে আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর নাযিলকৃত কোরআন বোঝা যেমন অসম্ভব,তেমনি অসম্ভব হলো সে কোরআনী হুকুমের প্রতিপালন ও পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও সবচেয়ে বড় অসামর্থতা হল এটি। এই একটি মাত্র অসামর্থতাই মানব জীবনের সকল অর্জনকে পুরাপুরি ব্যর্থ করে দেয়। আজকের মুসলমানরা যে কোরআনকে বুঝতে ও তার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে তার মূল কারণ হলো আল্লাহর হুকুমে লাব্বায়েক বলার সামর্থহীনতা। তাদের সামনে আল্লাহর কোরআন আছে,কোরআনের হুকুমও আছে এবং নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নতও আছে, কিন্তু যা নাই তা হলো সে হুকুমের ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ। এমন অসামর্থতাই মূলত আযাব ডেকে আনে। শুধু আখেরাতে নয়,দুনিয়াতেও। নামধারি মুসলমানরা তখন ইহুদীদের ন্যায় ভারবাহী পশুতে পরিণত হয়। মহান আল্লাহর নাযিলকৃত তাওরাত নিয়ে ইহুদীরা খুবই গর্ব করতো –যেরূপ গর্ব আজকের মুসলমানগণ করে পবিত্র কোরআনকে নিয়ে। কিন্তু তাদের আগ্রহ ছিল না তাওরাতে বর্নিত মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলি পালনে।সে অপরাধে মহান আল্লাহতায়ালা ইহুদীদেরকে ভারবাহি গর্দভ রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। পবিত্র কোরআনে সে বর্ণনাটি এসেছে এভাবে, “যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল অথচ তারা সেটি বহন করেনি তাদের দৃষ্টান্তটি হলো ভারবাহি গর্দভের ন্যায়।কতই না নিকৃষ্ট সে সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতগুলিকে অস্বীকার করে। আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন।” –(সুরা জুমু’আ, আয়াত ৫) ।ভারবাহি পশুদের পিঠে মূল্যবান কিতাবের বিশাল বোঝা থাকলেও সে কিতাবের শিক্ষা ও হুকুম-আহকাম নিয়ে তারা ভাবে না। এরূপ ভারবাহি গর্দভদের কাছে সেগুলির প্রতিষ্ঠাও গুরুত্ব পায় না। ইহুদীগণ তাই শুধু তাওরাতকে যুগ যুগ বহন করেই বেরিয়েছি,কিন্তু তার প্রতিষ্ঠায় মনযোগী হয়নি।মহান আল্লাহর কাছে ইহুদীগণ একারণেই ভয়ানক অপরাধী। এরূপ অপরাধীগণ কি কোন পুরস্কার পেতে পারে? সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে পথভ্রষ্টতাই যে এরূপ ভারবাহি গর্দভদের প্রকৃত প্রাপ্তি –পবিত্র কোরআনে সে হুশিয়ারিটিও বার বার এসেছে। আর সে পথভ্রষ্টতার পথ বেয়েই তাদের জীবনে ধেয়ে আসে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব। প্রশ্ন হলো,ইহুদীদের ন্যায় মুসলিম নামধারি ভারবাহি গর্দভও কি মুসলিম সমাজে কম? লক্ষ লক্ষ হাফেজ,আলেম ও মুসল্লি ব্যস্ত শুধু কোরআনের আয়াতগুলি তেলাওয়াত ও মুখস্ত করা নিয়ে,কিন্তু সেগুলির পালনে কোন আগ্রহই নেই। ফলে তাদের জীবনে জিহাদ বা কোরবানীও নেই। ফলে ইহুদীগণ যেমন তাওরাতের বিধান পালনে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ব্যর্থ হয়েছে ৫৭টির বেশী মুসলিম রাষ্ট্রের প্রায় একশত বিশ কোটি মুসলমান। তাই এসব মুসলিম দেশের কোনটিতেও মহান আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত শরিয়তি বিধানের নেই। কোন রাষ্ট্রে কতটা ধর্ম পালন হলো সেটির হিসাব কি মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা গুণে হয়? নামাযী,রোযাদার ও হাজীদের সংখ্যা দিয়েও কি সে বিচার চলে? পশু কোরবানির আয়োজন দেখেও কি হিসাব মেলে? সে বিচার তো হয় মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধান কতটা প্রতিষ্ঠা পেল তা থেকে। এজন্য তো চাই মানুষের জানমালের কোরবানী।নবীজী (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ তো সে পথেই দ্বীনের বিজয় এনেছিলেন, স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে নয়।

অশিক্ষা,দারিদ্র্য ও দুর্বৃত্তিতে মুসলমানগণ যে বিশ্বে রেকর্ড গড়ছে তার মূল কারণ তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের ব্যর্থতা। ফলে মুসলিম বিশ্বে তেলগ্যাস,ধন-সম্পদ ও জনসম্পদ বিপুল ভাবে বাড়লেও পরাজয় ও অসম্মান এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। নিছক কোরআন পাঠ ও কোরআনের মুখস্থ্য তেলাওয়াতে যেমন সে সামর্থ বাড়ে না,তেমনি বাড়ে না নিছক নামায-রোযা,হজ্ব-যাকাত পালনেও।কোরআন-পাঠ ও নামায-রোযা পালন এমন কি মোনফেক,ফাসেক বা জালেমের পক্ষেও সম্ভব।আল্লাহপাক চান,তাঁর প্রতিটি হুকুমের প্রতি ঈমানদারের আনুগত্য ও অঙ্গিকার প্রকাশ পাক তার প্রতিটি কথা,কর্ম ও আচরণে। ইসলাম সেটিকেই মোমেনের আজীবনের অভ্যাসে পরিণত করতে চায়। তাছাড়া যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালনে “লাব্বায়েক” বলতে পারে না সে ব্যক্তি কি নিজ বিবেকের ডাকে বা অন্য কোন ন্যায় কর্ম পালনে লাব্বায়েক বলতে পারে? আল্লাহর হুকুমে লাব্বায়েক বলার অভ্যাস গড়ে তোলার স্বার্থেই নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদত পালনে রয়েছে ধর্মীয় বাধ্য-বাধকতা। মু’মিনের জীবনে আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্যপূর্ণ সে শ্লোগানটি হলো ‘লাব্বায়েক’ অর্থাৎ “আমি হাজির”। যেখানেই আল্লাহর নির্দেশ,সেখানেই সে নির্দেশ পালনে ঈমানদার মাত্রই তাই প্রচন্ড অঙ্গিকার নিয়ে বলে উঠে “আমি হাজির”।

ঈমানদারের পুরস্কার যেমন বিশাল,দায়বদ্ধতাও তেমনি বিশাল।বিশাল পুরস্কারটি হলো অনন্ত অসীম কালের জন্য অফুরন্ত নিয়ামত ভরা জান্নাতলাভ। আর দায়বদ্ধতা হলো,আমৃত্যু আল্লাহর সৈনিক রূপে কাজ করা। আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের জানমাল কিনে নেন জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহর সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনের জান ও মাল এ মূল্যে কিনে নিয়েছেন যে তাদের জন্য হবে জান্নাত।(এবং বিনিময়ে)তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে করে,সে যুদ্ধে তারা (শত্রুদের) হত্যা করে এবং (নিজেরাও শত্রুদের) হাতে নিহত হয়।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)। মু’মিন হওয়ার অর্থ তাই মহান আল্লাহর ক্রয় করা সৈনিকে পরিণত হওয়া। তখন তার উপর একমাত্র আল্লাহর মালিকানার প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। এমন সৈনিক তখন কোন রাজা, স্বৈরাচারি শাসক বা সেক্যুলার নেতার ডাকে লাব্বয়েক বলে না।তাদের ডাকে যুদ্ধও করে না। যুদ্ধ করে না কোন বর্ণ,ভাষা বা দেশের জন্য। বরং যুদ্ধ করে একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনতে। সে সৈনিকদের প্রতি হুকুমদাতা হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। আজকের মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহর সে হুকুম আসেটি কোরআনী ফরমানের মধ্য দিয়ে।

মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সর্বাবস্থায় লাব্বায়েক বলতে গিয়ে ইব্রাহিম (আঃ) পিতা-মাতা,ঘরবাড়ী,এমনকি দেশছাড়াও হয়েছেন। বিচ্ছিন্ন হয়েছেন একমাত্র পুত্র ঈসমাইল ও বিবি হাজেরা থেকে। আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে খাদ্য-পানীয়হীন অবস্থায় ছেড়েছেন জনবসতিহীন মক্কার মরুর প্রান্তরে। যখন হুকুম পেয়েছেন একমাত্র পুত্রের কোরবানীর,তখনও তিনি দ্বিধাদ্বন্দে পড়েননি। প্রবল ঈমানী বল নিয়ে সে হুকুম পালনে লাব্বায়েক বলেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে এভাবে লাব্বায়েক বলার ক্ষেত্রে ইব্রাহীম (আঃ) হচ্ছেন সমগ্র মানব ইতিহাসে এক মহান আাদর্শ। “লাব্বায়েক” বলেছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)এর স্ত্রী বিবি হাজেরা এবং শিশু পুত্র ঈসমাইল(আ)ও। হযরত ঈসমাইল(আ)কে যখন বলা হয়েছিল,আল্লাহতায়ালা তোমার জানের কোরবানী চান তখন তিনিও সাগ্রহে বলেছিলেন,“লাব্বায়েক”। অথচ বাঁচবার স্বপ্নসাধ কার না থাকে? কিন্তু আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ জীবনে আর কি থাকতে পারে? শিশু ঈসমাইলও সেটি বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন তাঁর মহান বিবি হাজেরাও। ফলে ঘরবাড়ী ও গাছপালা নেই,খাদ্য-পানীয় ও কোন প্রাণীর আলামত নেই -এমন এক মরুর বুকে শিশু পুত্রকে নিয়ে একাকী অবস্থানের হুকুম এলে তিনিও তখন লাব্বায়েক বলেছিলেন। অতি কষ্টে প্রতিপালিত একমাত্র সে শিশু ইসমাইলককে যখন কোরবানী করার হকুম হলো বিবি হাজেরা তখনও দ্বিধান্বিত হননি। আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার চেয়ে বাঁচবার অন্যকোন উচ্চতর প্রেরণার কথা তিনি ভাবতেই পারেননি। তাই তিনি মহান আল্লাহর প্রতি নির্দেশে লাব্বায়েক বলেছেন সমগ্র অস্তিত্ব ও অঙ্গিকার নিয়ে। এভাবে আল্লাহর ডাকে সর্বাবস্থায় লাব্বায়েক বলার যে শিক্ষা ইব্রাহীম (আ) এবং তাঁর পরিবার রেখেছেন তা সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে আজও  অনন্য হয়ে আছে। প্রতি যুগের মুসলমান বাঁচবে সে ইব্রাহীমী মিশন নিয়ে। আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁর পরিবারের মিশনে ও আত্মত্যাগে এতই খুশি হয়েছিলেন যে সেটিকে পবিত্র কোরআনে বার বার উল্লেখ করেছেন। তাঁর সে মহান সূন্নতকে আল্লাহতায়ালা হ্জ্ব রূপে ফরয করেছেন। এভাবে সুস্পষ্ট করেছেন,আল্লাহপাক মোমেনের কোন ধরণের আমলে অত্যন্ত খুশি হন সেটিও।

লাব্বায়েক যেখানে শয়তানের ডাকে

শুধু নামায-রোযা পালন,কিছু অর্থদান, কিছু সময়দান বা হজ্ব করে যারা আল্লাহকে খুশি করার স্বপ্ন দেখেন ইব্রাহীম (আঃ)এর শিক্ষা থেকে তাদের বোধোদয় হওয়া উচিত। কারণ আল্লাহ চান,তাঁর হুকুমের প্রতি সর্বাবস্থায় ও সর্বসময়ে পূর্ণ-আনুগত্য। তাই শুধু হজ্বে গিয়ে লাব্বায়েক বলায় কল্যাণ নেই। আল্লাহর নির্দেশের প্রতি লাব্বায়েক বলতে হবে দেশের রাজনীতি,সমাজনীতি, অর্থনীতি,শিক্ষা-সংস্কতি তথা সর্বক্ষেত্রে। তাই যে দেশে আল্লাহর শরিয়ত ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা নেই এবং সে লক্ষ্যে কোন চেষ্টাও নেই –বুঝতে হবে আল্লাহর হুকুমের ডাকে সেদেশে লাব্বায়েক বলার লোকও তেমন নেই। সূদী ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতি এবং পর্দাহীনতা,নাচ-গান,অশ্লিল যাত্রা-সিনেমা যে দেশের সংস্কৃতি,সেদেশ তো ঝান্ডা উড়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। যে মহিলা হজ্ব করে অথচ বেপর্দা ভাবে জনসম্মুখে চলাফেরা করে,বুঝতে হবে হজ্ব কালে তার মুখে লাব্বায়েক ধ্বনিত হলেও তাতে সাচ্চা ঈমানদারি ছিল না। সেটি ছিল নিছক আচার,আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমানদারি নয়। এমন হাজীরা তো শয়তানের ডাকেও লাব্বায়েক বলে। তাদের বেপর্দাগী ও রাজনীতিতে পুঁজিবাদ, জাতিয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠায় তাদের আগ্রহ সেটি তো তারই আলামত। এমন ভন্ডদের কারণেই বাংলাদেশে মত মুসলিম দেশগুলিতে হাজীর সংখ্যা বাড়লেও আল্লাহর শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠার জিহাদে লাব্বায়েক বলা লোকের সংখ্যা বাড়ছে না। বরং বিপুল ভাবে বাড়ছে শয়তানের হুকুমের প্রতি লাব্বায়েক বলার লোক। ফলে বাড়ছে সূদী ব্যাংক,বাড়ছে পতিতাপল্লি, বাড়ছে দূর্নীতি,বাড়ছে মদ্যপান,বেপর্দাগী ও ব্যাভিচার। বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তো এরূপ বিদ্রোহীরাই বিজয়ী। এরা হজ্ব পালন করে নিছক ধর্মীয় আচার রূপে,আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মিশনকে নিজ জীবনে গ্রহণ করার ব্রত নিয়ে নয়।

আল্লাহতায়ালা চান,তাঁর বান্দাহর ইসলামে পুরাপুরি প্রবেশ। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে,“উদখুলুস সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থাৎ ইসলামে প্রবেশ কর পুরাপুরি ভাবে। তাই ঈমানদাদিরর অর্থ শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালন নয়,সেটি মিথ্যাচর্চা,সূদ-ঘুষ,ব্যাভিচারি,বেপর্দাগীর ন্যায় সকল প্রকার অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকাও। নইলে নেমে আসে কঠিন আযাব। মহান আল্লাহর সে কঠোর ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখান কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে হীনতা এবং কিয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির মধ্যে নিক্ষপ্ত হবে। তারা যা করে আল্লাহ সে সম্বন্ধে বেখবর নন।” -সুরা বাকারা, আয়াত ৮৫। ইসলামে পুরাপুরি প্রবেশের সে ছবকটি দেয় হজ্ব। সেটি লাব্বায়েক বলার সামর্থটি চেতনার গভীরে প্রথীত করার মধ্য দিয়ে। তখন মু’মিন ব্যক্তিটি শুধু আযানের ডাকে বা হজ্বের ডাকে শুধু লাব্বায়েক বলে না, জিহাদের ডাকেও লাব্বায়েক বলে। তখন বিজয় এসেছে আল্লাহর দ্বীনের।

আযাবের গ্রাসে

মুসলমানদের আজকের যে বিশ্বব্যাপী পরাজয়,পশ্চাদপদতা ও হীনতা,সেটি কি উপরে উল্লেখিত আয়াতকেই শতভাগ সত্য প্রমানিত করে না? এ হীনতা যে আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? মুসলিম বিশ্ব বস্তুত সে প্রতিশ্রুত আযাবের গ্রাসে। বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি মুসলমানের মানসম্মান ও ইজ্জতের এখনো কি কিছু অবশিষ্ঠ আছে? স্রেফ খাদ্য-উৎপাদন,শিল্প-উৎপাদন,সড়ক-উন্নয়ন বা শিক্ষার হার বাড়িয়ে কি এ হীনতা ও অপমান থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? মুসলমানদের মাঝে ইসলামের আংশিক অনুসরণ করে তথা নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালন করে,এমন লোকের সংখ্যা আজ কোটি কোটি।কিন্ত মুসলিম সমাজে সূদখোর,ঘুষখোর,মদখোর ও ব্যাভিচারির ন্যায় আল্লাহর অবাধ্য মানুষের সংখ্যাও কি কম? মুসলিম রাষ্ট্রগুলির রাজনীতি,অথনীতি ও আইন-আদালতেও সবটুকু জুড়ে আল্লাহর অবাধ্যতা, সেখানে বাস্তবায়ন ঘটেনি শরিয়তের। অথচ পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি হলো,“যারা আল্লাহর মার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারা কাফের, …তারা জালেম ..তারা ফাসেক।” -সুরা মায়েদা,আয়াত ৪৪-৪৭)।” প্রশ্ন হলো,মুসলিম বিশ্বের কোথায় আজ  আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ অনুসরণ? ইসলামের নামে মুসলমানদের মাঝে যা বেড়েছে তা তো আংশিক অনুসরণ মাত্র। এমন আংশিক অনুসরণই তো মহান আল্লাহর আযাব ডেকে আনার জন্য যথেষ্ঠ। সে আযাবের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতিই তো শুনিয়েছে উপরুক্ত আয়াত।

চেতনার ভূমি কখনোই খালি থাকে না। আল্লাহর স্মরণ বা জিকর সেখানে স্থান না পেলে সে ভূমি অধিকৃত হয় শয়তানের হাতে। যার মধ্যে ইসলামের পুরাপুরি অনুসরণ নেই,তার জীবনে যা প্রবলতর হয় সেটি শয়তানের অনুসরণ।এমন ব্যক্তিরাই রাজনীতি,শিক্ষাসংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রে শয়তানের ডাকে ‘লাব্বায়েক’ বলে। মুসলিম দেশগুলিতে আজ যে বিধান প্রতিষ্ঠিত সেটি আল্লাহর বিধান নয়,সেটি মানুষের গড়া। ইসলামের বদলে প্রতিষ্ঠা পেযেছে সেকুলারিজম। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে পতিতাবৃত্তি,সূদ-ঘুষ ও দূর্নীতি যেরূপ আইনগত বৈধতা পেয়েছে,তাতে কি প্রকাশ পায় না যে এটি শয়তানের অনুসরণ?

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহতায়ালার প্রতি দ্বিধাদ্বন্দহীন আনুগত্যের প্রতীক,এমন ব্যক্তিকে বলা হয় হানিফ। তিনি হলেন মুসলিম উম্মাহ বা মিল্লাতের আদি পিতা। নিজ জীবনের মূল মিশন ও ভিশন রূপে যে বিখ্যাত বাক্যটি তিনি সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন তা আজও  যে কোন ঈমানদারে জীবনে পথ চলায় নির্দেশনা দেয়। তাঁর সে বিখ্যাত বানী যা আজও  অমর। সেটি হলো,‘‘ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন।’’ অর্থঃ "নিশ্চয়ই আমার নামাজ,আমার কোরবাণী,আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু সবকিছুই রাব্বুল আলামীনের জন্য।" ইব্রাহীম (আঃ) এর মুখ থেকে বের হওয়া এ কথাগুলো মহান রাব্বুল আ’লামীনের এতই পছন্দ হয়েছিল যে সেগুলিকে তিনি কেয়ামত অবধি অক্ষয় করে রেখেছেন,এবং সেটি পবিত্র কোরআনে তাঁর নিজের কথার পাশে লিপিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে। এভাবে এ কথাগুলোর অনুসরণ বাধ্যতামূলক করেছেন প্রতিটি মুসলমানের উপর। প্রতিটি পশু কোরবানীতে আজও  কোরবানীদাতাকে কোরআনের এ আয়াতকে উচ্চারণ করতে হয়। তাই কোরবানী নিছক পশু কোরবানী নয়,বরং নিজের মধ্যে বেড়ে উঠা পশু-চেতনা তথা স্বার্থ-চিন্তার কোরবানী। মুসলমান যে নিজেকে খুশি করার জন্য বাঁচে না বরং বাঁচে মহান আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে হজ্ব ও ঈদুল আযহার পশু কোরবানীর মধ্যে দিয়ে সেটিই উচ্চারিত হয়। প্রতিক্ষণে এটিই হতে হবে ঈমানদারের বাঁচবার মূল প্রেরণা। হজ্ব ও ঈদুল আযহা মূলতঃ সেটিই শেখায়।

মহান আল্লাহতায়ালার ইনষ্টিটিউশন

হজ্ব মূলতঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর পরিবারের সূন্নত। এটি হল আদি পিতার আদর্শের সাথে পরবর্তীকালের মুসলমানদের একাত্মতার মহড়া। আল্লাহপাক তাঁর এই মহান বান্দাহ ও তাঁর পরিবারকে এভাবেই মহাসন্মানিত করেছেন।আল্লাহতায়ালা চান তার অনুগত বান্দাহগণ হযরত ইব্রাহীমের (আ) আদর্শে গড়ে উঠুক। গড়ে তুলুক এমন এক বাহিনী যার প্রতিটি সৈনিক হযরত ইব্রাহীম (আ)এর মতই আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশে দ্বিধাহীন চিত্তে লাব্বায়েক বলবে। অনুগত বান্দাদের জন্য তিনিই শ্রেষ্ঠতম মডেল। ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) যে ভাবে এ মডেলকে অনুসরণ করেছিলেন সেটি ফরজ সকল মুসলমানের জন্যও। বস্তুতঃ হজ্ব হল সূন্নতে ইব্রাহীম (আ)এর আলোকে সত্যনিষ্ঠ মু’মিন গড়ার পবিত্র ইনষ্টিটিউশন। মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের ছবকই এর মূল পাঠ। আল্লাহতায়ালার অনুগত বান্দারূপে ঈমানদারের কি দায়িত্ব সে বিষয়ে ঘর থেকে বহুদূরে একান্ত নিবিড়ে নিয়ে মিনায়, আরাফায় বা মোজদালেফায় বসিয়ে ভাববার সুযোগ করে দেয়।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্রের সূন্নতকে প্রতিপর্বে হাজীদের পালন করতে হয়। অন্যথায় হজ্ব হয় না। বিবি হাজেরা তার শিশুপুত্রের তৃষ্ণা মেটাতে যেভাবে পানির খোঁজে সাফওয়া ও মারওয়ার মাঝে দৌড়িয়েছিলেন আজও  প্রতিটি হাজীকে -তা বৃদ্ধ হোক বা জোয়ান হোক,নারী হোক বা পুরুষ হোক,রাজা হোক বা প্রজা হোক,সকলকেই সেভাবে দৌড়াতে হয়। ‘সায়’ অর্থ প্রচেষ্ঠা। পানিহীন মরুভূমির মাঝেও হতাশ না হয়ে বিবি হাজেরা যেরূপ পানির খোঁজে স্বচেষ্ট হয়েছিলেন,তেমনি স্বচেষ্ট হতে হবে প্রতিটি মুসলমানকে তার জীবন-সমস্যার সমাধানে। তথা কল্যাণকর কাজে। এখানে কোন অলসতা চলে না। তাঁর সে নিরলস প্রচেষ্ঠাটি মানব জাতির জন্য এতটাই শিক্ষণীয় যে বিবি হাজেরার সে সূন্নত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে হজ্বের ফরজ বিধান রূপে। সভ্যতা সভ্যতর হয় এবং মানব-জীবন উন্নততর হয় তো কল্যাণ কর্মে এমন প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠার কারণেই। এ চেতনাতেই মুসলমান তাই ভিক্ষুক হয়না,হতাশ ও হতোদ্যম হয় না এবং কর্ম থেকে অবসরও নেয় না। বরং সর্বাবস্থাতে আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশে মেধা,শ্রম,সময় ও রক্ত বিণিয়োগ করে। অর্থাৎ মু’মিনের “সায়” শুধু সাফা ও মারওয়ার মাঝে শেষ হয় না,বরং সেটি আমৃত্যু চলে। মু’মিনের জীবনে এজন্যই কোন অবসর বা রিটায়ারমেন্ট নাই।এটি সেক্যুলার ধারণা।

বিবি হাজেরা ছিলেন একজন নগণ্য দাসী। তাই ইব্রাহীম (আ)এর নিঃসন্তান প্রথম স্ত্রী বিবি সারার আপত্তি ছিল না তাঁকে স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করায়। আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্যের কারণেই বিবি হাজেরা পুরস্কৃত হয়েছেন। আল্লাহপাক এভাবে সম্মানিত করেছেন এক নারীকে। এমন মহাসম্মান কোন রাজাবাদশাহ বা সম্ভ্রান্ত বংশের কোন অভিজাত নরনারীর ভাগ্যে জুটেনি।কোন পয়গম্বরের ভাগ্যেও জুটেনি। বরং পেয়েছে এমন এক বৃদ্ধা মা যিনি তাঁর একমাত্র সন্তানের কোরবানীর নির্দেশে নিঃসংকোচে লাব্বায়েক বলেছিলেন।। পিতা-মাতার সাথে একাত্ম হয়ে ইসমাইল (আঃ)যে ভাবে নিজেকে কোরবানী করতে লাব্বায়েক বলেছিলেন সেটিও সমগ্র মানব-ইতিহাসে অনন্য। মানুষের আমল তো পুরস্কৃত হয় তার নিয়তের ভিত্তিতে। সে নিয়তে কি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর মাঝে কোন কমতি ছিল। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন নিজের চোখ বেঁধে পুত্র ইসলামের গলায় ছুড়ি চালাচিছলেন তখন তো হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-এ দুজনের কেউ জানতেন না যে আল্লাহতায়ালা হযরত ইসলমাঈল (আঃ)র বদলে ভেড়াকে সেখানে কোরবানীর জন্য পেশ করবেন। তাই তাদের কোরবানী মহান আল্লাহর দরবারে সেদিন গৃহীত হয়েছিলে। পশু কোরবাণীর মধ্য দিয়ে তাদের সে আদর্শের সূন্নত পালন করতে হয় বিশ্বের মুসলমানদের। এটি না করলে হাজীদের হজ্ব পালনই হয় না।

হজ্ব নিজেই কোন লক্ষ্য নয়,মানুষকে একটি মহত্বর লক্ষে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া মাত্র। আল্লাহর চুড়ান্ত লক্ষ্যটি হলো তার দ্বীনকে বিজয়ী করা। পবিত্র কোরআনে যেমন বলা হয়েছে,"হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ তিনি তাঁহার রাসূলকে প্রেরণ করেছেন এ জন্য যে দুনিয়ার সকল দ্বীনের উপর এটি বিজয়ী হবে।-(সুরা ছফ,আয়াত ৯)।তবে এ বিজয় এমনিতে আসে না। এ কাজ ফেরেশতাদেরও নয়। বরং একাজ নিতান্তই মানুষদের। এ কাজ সমাধার জন্য ফেরেশতা হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই,তেমনি সুফি বা দরবেশ হওয়াও জরুরী নয়। বরং চাই জিহাদ। চাই সে জিহাদে অর্থদান,শ্রমদান, রক্তদান,এমনকি প্রাণদান।ইসলাম-বিরোধীদের নির্মূলে জরুরী হলো এমন এক বাহিনীর যারা আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশের প্রতি নিষ্ঠারসাথে লাব্বায়েক বলবে। যেমনটি হযরত ইব্রাহীম (আ) বলেছিলেন। নইলে বিজয় অসম্ভব। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ফেরেশতাকুল নেমে আসে একমাত্র তখনই যখন পৃথিবী পৃষ্ঠে এমন একটি বাহিনী আল্লাহর পথে জান ও মালের কোরবানীতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আল্লাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এমন একটি বাহিনী গড়তে পেরেছিলেন বলেই তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। মুসলমানরাই হচ্ছে এ কাজে তার একমাত্র বাহিনী। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা সে বাহিনীকে আখ্যায়ীত করেছেন ‘হিযবুল্লাহ’ বা আল্লাহর দলরূপে। তবে নিছক দলই যথেষ্ট নয়। সে দলের জন্য লাগাতর ট্রেনিংও অপরিহার্য। সে ট্রেনিং শুধু দৈহিক নয়; আর্থিক ও আত্মীক হওয়াটাও জরুরী। নইলে অর্থ, রক্ত ও অর্থদানের জজবা আসবে কোত্থেকে? হজ্বের মধ্যে সমন্বয় ঘটেছে সবগুলীরই। লাব্বায়েক হলো বস্তুতঃ এ বাহিনীর শপথ বাক্য। এখানে শপথ আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের। এটি হলো তাঁর লা-শরিক ওয়াহদানিয়াতের স্বীকৃতি এবং সে সাথে আল্লাহর ডাকে সদাসর্বদা লাব্বায়েক বলার। হাজীদের তাই বলতে হয়,"লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক,লাব্বায়েক লা-শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়ামাতা লাকাওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাকা লাব্বায়েক।"

ইতিহাসের উম্মূক্ত যাদুঘর

ইসলামের বিজয় আনার দায়ভারটি একার নয়,এ কাজ সমষ্টির। তাই প্রয়োজন, এ বাহিনীর অন্য সবার সাথে এক সাথে বসার। প্রয়োজন হলো,নানা বর্ণ,নানা ভাষা ও নানা দেশের এ বিশ্ববাহিনীর সৈনিকদের পারস্পারিক পরিচয়ের। প্রয়োজন হলো,একে অপরের সমস্যার অনুধাবনের এবং একসাথে চিন্তাভাবনা ও স্ট্রাটিজী প্রণয়নের। এজন্য জরুরী হলো বিশ্বভাতৃত্ব। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো প্যান-ইসলামিক চেতনায় দীক্ষা নেওয়া। বিশ্বভাতৃত্ব তাই মুসলমানের রাজনৈতিক শ্লোগান নয়,এটি তার গভীর ঈমানের আত্ম-চিৎকার। ফলে ঈমানদার ব্যক্তি পুতুল-পুজাকে যতটা ঘৃনা করে, ততটাই ঘৃনা করে বর্ণবাদ,গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদকে। কারণ এগুলো হলো মুসলমানদের বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের বিরুদ্ধে ঘাতক ভাইরাস। আজ  মুসলমানেরা যেভাবে বিভক্ত,শক্তিহীন ও বিপর্যস্ত তা তাদের মাঝে কোন পুতুল পুজার কারণে নয়। বরং সেটি ভিন্ন ভিন্ন ভূগোল,ভাষা,বর্ণ ও গোত্র-ভিত্তিক জাহেলী চেতনার কারণে। হজ্ব সে পাপাচার থেকে দূরে এনে মুসলমানদেরকে এক মহা-সম্মেলনে হাজির করে।এখানে ধনি-দরিদ্র,রাজা-প্রজা,সাদা-কালো সবার পোষাক যেমন এক তেমনি আত্মার আকুতি ও উচ্চরণও এক। লক্ষ্য একটিই এবং সেটি হলো আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া এবং তাকে খুশি করা। এমন এক মহা-সম্মেলনের লক্ষ্যেই আল্লাহপাক তার নিজের ঘর বায়তুল্লাহ গড়েছিলেন। সেটিও নির্মিত হয়েছিল ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ)র হাত দিয়ে। এটি তাই ইতিহাসের কাদিম যাদুঘর,এবং সে সাথে ইন্সটিটিউশনও।এখানে পা রেখেছিলেন হযরত ইব্রাহীম,হযরত ঈসমাইল,বিবি হাজেরা,শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর বিখ্যাত সাহাবাগণ।এ নগরের প্রতিটি প্রান্তর,প্রতিটি অলিগলি,প্রতিটি পাথর এবং প্রতিটি ধুলিকণায় জড়িত রয়েছে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের স্মৃতি। এখানে রয়েছে হাজরে আসওয়াদ,মাকামে ইব্রাহীম,আরাফা,মিনা ও মোজদালেফা। মারেফাতের তথা আল্লাহর সান্নিধ্যলাভের প্রানকেন্দ্র হলো এগুলি।আল্লাহর সৈনিকদের শপথ বাক্য উচ্চারণের এর চেয়ে পবিত্রতম আয়োজন আর কি হতে পারে? আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা মানব সভ্যতার এ শ্রেষ্ঠ ভূমিতে দাঁড়িয়েই আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশে লাব্বায়েক বলেছিলেন। ফলে গড়ে উঠেছিল ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর মানব। এ পবিত্র প্রাঙ্গণের প্রতিটি ধুলিকণা আজও  মানুষকে সেই একই পথে চলতে নির্দেশ দেয়। এখানকার আলো-বাতাস প্রতিটি হাজীর কানে আজও  একই সূরে “আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক”এর ধ্বনি শোনায়। ইতিহাসের সেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একই শপথ উচ্চারন করে বিশ্বের নানা কোন থেকে আগত আজকের ঈমানদারগণও।আত্মীক উন্নয়নের এর চেয়ে পবিত্রতম স্থান এবং পবিত্রতম আয়োজন আর কি হতে পারে? এর চেয়ে উত্তম মারেফতি ধ্যান কি আর কোথাও হতে পারে?

যে কারণে শ্রেষ্ঠতম এবাদত

আন্তর্জাতিক এ মহাসম্মেলনের আয়োজক মহান আল্লাহতায়ালা খোদ নিজে। নইলে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ সম্মেলনটি চৌদ্দ শত বছর ধরে সম্ভব হত না। নানা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দুর্যগের মাঝেও এ বিশাল সম্মেলনটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অন্যরা এখানে মেহমান, খোদ আল্লাহতায়ালা এখানে মেজবান। আল্লাহর উদ্দেশ্যে হওয়ায় এ সম্মেলনে যোগ হয় পবিত্রতা। লক্ষ্য যখন এক ও অভিন্ন,তখন দ্বন্দ থাকে না। দলাদলিও থাকে না। নানা বিভিন্নতা থেকে এসে এখানে এসে সবাই অভিন্ন হয়ে যায়।বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ছুটে আসে নিজস্ব অর্থে। কারো অনুদানের প্রয়োজন হয়না। হেজাজের পুণ্যভূমি যখন বৈষয়িক সম্পদে দরিদ্র্য ছিল তখনও এ হজ্ব আয়োজিত হয়েছে মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে। মক্কা হলো ইসলামের মূক্ত নগরী। এখানে আসার জন্য অনুমতিরও প্রয়োজন নেই। আসতে বাধা দেওয়াই চরম অধর্ম। বাধা দিলে সে বাধা অপসারণ করা সকল মুসলমানের ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে পড়ে। এভাবেই নিশ্চয়তা বিধান হয়েছে এ বিশ্ব সম্মেলনের।

আরাফার মহা জমায়েত,মোযদালিফায় রাত্রিযাপন,কাব্বার তোয়াফ এবং শয়তানের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের পর মুসলিম বিশ্বে আসে ঈদুল আযহা। আনে ঈদ তথা খুশি। প্রকৃত ঈদ বা খুশির প্রকৃত কারণটি নিজের বা অন্যের জন্ম নয়,বরং সেটি নিজের অর্জিত সাফল্য। মাতৃগর্ভ থেকে নিজের জন্মলাভে ব্যক্তির নিজের কোন কৃতিত্ব থাকে না,সে দানটি তো মহান আল্লাহর। ফলে প্রশংসা তো একমাত্র তারই প্রাপ্য। তাই খৃষ্টান ধর্মে এবং অন্যান্যে ধর্মে ধর্মীয় নেতার জন্ম দিবস পালনের রীতি থাকলেও ইসলামে সেটি নাই। তাই সাহাবায়ে কেরাম নবীজী (সাঃ)র জন্ম দিন পালনে করেছেন সে নজির নেই। মুসলমানের জীবনে প্রকৃত ঈদ মাত্র দুটি। একটি মাহে রমযানের,অপরটি ঈদুল আযহার। এ দুটি ঈদে উযপাপিত হয় ঈমানদারের জীবনের দুটি বিশাল বিজয়। একটি মাহে রমযানের মাসব্যাপী রোযা পালনের, অপরটি হজ্ব পালনের তথা আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ অর্জনের। সে

হজ্ব যেন রোজ-হাশর বা বিচারদিনের মহড়া। সর্বত্র এক পোষাক,এক বর্ণ,একই আওয়াজ। সবার মধ্যে একই পেরেশানী। নানা দেশের নানা ভাষার মানুষ এখানে এক মানবসমুদ্রে লীন। মাথায় টুপি নেই,পায়ে জুতা নেই,গায়ে জামা নেই,আভিজাত্য প্রকাশের কোন মাধ্যমও নেই। দুই টুকরো সিলাই হীন কাপড় নিয়ে সবাই এখানে একই সমতলে। কাফনের কাপড় পরে লাশেরা যেন কবর থেকে লাখে লাখে বেরিয়ে এসেছে। সাদা-কালো,আমির-ওমরাহ,নারী-পুরুষ সবাই এখানে একাকার। সবাই ছুটেছে একই লক্ষ্যে। বান্দার সুউচ্চ লাব্বায়েক ধ্বনি আল্লাহর উপস্থিতিকে যেন স্মরন করিয়ে দেয়। আল্লাহর স্মরণে কেঁপে উঠে বান্দার দেহ, মন তথা সমগ্র অস্তিত্ব। এখানে ভয়, বিনয় ও আনুগত্যের ভাব সর্বত্র। সবাই ঘুরছে আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে। রোজ হাশরের দিনে মানুষ যে কত অসহায় হবে হজ্ব সেটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃত্যূবরণ না করেও যেন মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। ফলে প্রেরণা মেলে সময় থাকতে জীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের। গুরুত্ব পায় আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার। পরকালীন সাফল্য লাভে এ মূল্যায়নটুকুই তো মূল। এমন উপলদ্ধি ছাড়া আল্লাহতে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও শয়তানের দাসত্বমূক্তি কি সম্ভব? হজ্ব তো সে সুযোগই এনে দেয়। সম্ভবতঃ এ জন্যই এটি ইসলামের শ্রেষ্ঠতম এবাদত।কিন্তু সে শ্রেষ্ঠ ইবাদতের সে শিক্ষা আজকের মুসলমানের জীবনে কই? আজকের মুসলমানদের জীবনে এটাই কি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা নয়? প্রথম সংস্করণ ২০/১০/২০১২, দ্বিতীয় সংস্করণ ১২/১০/২০১৩, তৃতীয় সংস্করণ ২৮/৯/২০১৪।



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (1)
Welcome
1 Wednesday, 01 October 2014 04:00
Dr. Samiul hAQUE

Dear Dr. Firoz


Salam. I am proud of you for continuing defending the Islamic dignity. I have posted this article in my web site by your permission. May you be shining in this world and in the resurrection day with all of your relatives, By the grace of Allah SWT, Hazrat Muhammad peace be upon you & his Ahlebait. Thanking regards. - Dr. Md. Samiul Haque, Almustafa international University, Iran.

 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.